Movie Review: Mahalaya by Soumik Sen

 

বাঙালির ১২ মাসে ১৩ পার্বণ হলেও, যে উৎসবের জন্য সারা বছর অপেক্ষা করে থাকে, তা হল দুর্গাপুজো। আর পুজো মানেই ‘অশ্বিনের শারদ প্রাতে…”

ব্যারিটোন হয়তো নয়, কিন্তু বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের অমোঘ কণ্ঠে মহালয়ার সকালে বাঙালির চেতনা ও কৃষ্টি এক উৎকর্ষ লাভ করে। প্রায় এক শতক ধরে যার কণ্ঠস্বরে দেবীর আগমন বার্তায় মেতে ওঠে এই ভুবন, সেই বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রকে কিনা আকাশবাণী মহিষাসুরমর্দিনী থেকে বাদ দিতে চেয়েছিল। কিন্তু ইতিহাস তাঁকে বিস্মৃতির আড়ালে হারিয়ে যেতে দেয়নি। প্রতিবাদে উত্তাল বাংলার জনাদেশের কাছে নতিস্বীকার করতে বাধ্য হন দিল্লির বাবুরা। এমনই এক ‘ঐতিহাসিক’ কাহিনীকে দর্শকদের কাছে তুলে ধরেছেন পরিচালক সৌমিক সেন।

‘মহালয়া’ – একমেটে, দোমেটে থেকে তিলে তিলে যেমন গড়ে ওঠে মৃন্ময়ী প্রতিমা, ঠিক তেমনই লালনের সাথে চিত্রনাট্যের রচনা করেছেন পরিচালক। প্রেক্ষাপট ১৯৭৫-৭৬। জরুরি অবস্থা জারি হয়েছে দেশে। ‘ওপরওয়ালার’ মর্জিমত চলছে সমগ্র প্রশাসন। তাঁর রোষানল থেকে রেহাই নেই কারও – এমনকি সরকারি অনুষ্ঠানে পারিশ্রমিক দাবি করা কিশোর কুমারকেও রেয়াৎ করা হবে না। ইতিহাসের পাতা থেকে তাঁর নাম মুছে ফেলার হুমকি যিনি হেলায় দিতে পারেন, এহেন দিল্লিবাবুর কাছে যে বাঙালি সেন্টিমেন্টের ‘ভ্যালু’ নেই তা বোঝার জন্য মগজাস্ত্রের প্রয়োগ করতে হবে না। নস্টালজিয়া মূল্যহীন। চাই চমক। তাই আকাশবাণীর বহুল জনপ্রিয় ‘মহিষাসুরমর্দিনী’-র পরিবর্তন চাই। চাই তারকা। আর ‘সত্যজিৎ বাবু’ যখন বলেছেন বাংলায় ষ্টার একজনই, সেই উত্তম কুমারকেই দিল্লিবাবুর চাই। বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রর জায়গায়।

শত সংশয় সত্ত্বেও উত্তম কুমার রাজি হয়ে যান এই ঐতিহাসিক অনুষ্ঠানে ভাষ্যকারের ভূমিকা পালন করতে। বলা ভাল, ওনাকে একরকম জেদ করে রাজি করান ‘বড়দা’ হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। পঙ্কজ মল্লিকের একনিষ্ঠ ছাত্র হওয়া সত্ত্বেও গুরুকে ছাপিয়ে যাওয়ার এক অদম্য ইচ্ছে, এবং মনে জমে থাকা একরাশ অভিমানের সমাপতন হেমন্তের মধ্যে। পুরনো সব বাতিল। বাংলার শিল্পী শুধু নয়, লতা, আশা, মান্না – বম্বের বাঘা বাঘা তারকা কণ্ঠে সমৃদ্ধ হবে ‘দুর্গতিহারিণী’, বেতারের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা হবে ওনার নাম, এটাই লক্ষ্য ওনার।

শেষরক্ষা কি হয়েছিল? উত্তরটা সবার জানা। সংশয় প্রকাশ স্বয়ং মহানায়কের – “পুজো এলো কি?”

ইতিহাসধর্মী একটি পিরিয়ড ফিল্ম, যেখানে উত্তম কুমার থেকে শুরু করে পঙ্কজ মল্লিক, হেমন্ত, বীরেন্দ্র কৃষ্ণদের মত আইকনদের নিয়ে গল্প, সেখানে চরিত্রায়ন যে সুনিপুণ হতেই হবে, তা বলাই বাহুল্য। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকি অবশ্যই উত্তম কুমারের চরিত্রে অভিনয় করা। ইতিমধ্যেই মহানায়কের ওপর চিত্রায়িত একটি টেলিসিরিজ ফ্লপ হয়েছে। বাঙালি জাতিগতভাবে যে নিজেদের আইকনদের ভগবানের আসনে বসিয়ে রাখতে ভালোবাসে, সেই উল্লেখও রয়েছে এই সিনেমায়।

তাই, এই ছবির সবচেয়ে বড় পাওনা আমার মতে যীশু সেনগুপ্ত। বাঙালির ম্যাটিনি আইডলের অমলিন আপিল অক্ষুন্ন রেখেই তিনি উত্তম কুমারের চরিত্রে স্বকীয়তায় সমুজ্জ্বল। উত্তমবাবুকে কপি করার দুঃসাহস তিনি দেখাননি, আবার নিজের চেনা ম্যানরিজম থেকে বেরিয়ে এসে এক অনবদ্য অভিনয় উপহার দিয়েছেন আমাদের। ওনাকে সেয়ানে সেয়ানে টক্কর দিয়েছেন সুভাশিষ বাবু। একদিকে যখন বেতার থেকে বীরেন্দ্রকৃষ্ণকে মুছে ফেলার তোড়জোড় চলছে, অন্যদিকে মাছের বাজারে ওনার সমাদর। মন ছুঁয়ে যায়। বীরেন্দ্র কৃষ্ণ এবং উত্তম কুমারের সাক্ষাতের সিনে হলে বসে যার গায়ে কাঁটা দেয়নি, তার রক্তে বাঙালিয়ানার পরিমাপ নিয়ে সন্দেহ আমার থাকবে।

রবীন্দ্রনাথও যার সুর বদলাতে চাননি, সেই পঙ্কজ মল্লিকের অনুষ্ঠান বাতিল করবে আকাশবাণী! এহেন চরিত্রে অভিনয় করা যে চাট্টিখানি কথা নয়, তার প্রমাণ রাখলেন শুভময় চ্যাটার্জি। পঙ্কজ মল্লিকের ভূমিকায় তিনি নাড়া দিয়েছেন অবশ্যই, কিন্তু এক দৃশ্যে একজন জনৈক উগ্র হিন্দুবাদীর সাথে ওনার বাদানুবাদের পর্বটি সেরা। নির্মেদ, নিরলস, সাবলীল অভিনয়ের ছাপ রেখেছেন অবশ্যই সপ্তর্ষি রায়। চিত্রনাট্যের চাহিদায় ‘বড়দা’র অহং মিশ্রিত অদম্য জেদ হয়তো অনেকটাই ‘ভিলেন’ এ পরিণত হতে পারত, কিন্তু সপ্তর্ষি বাবুর অভিনয়ে হেমন্ত বাবুর ‘গ্রে শেড’ টা হারিয়ে যায়নি।

‘মহালয়া’ ট্রেলারটি দেখে মনে হয়েছিল হয়তো সিনেমাটা মেলোড্রামাটিক হবে। আমার সংশয় যে অমূলক ছিল তার কৃতিত্ব অবশ্যই লেখনীর। পরিচালক মশাই স্বয়ং এবং আমাদের সকলের প্রিয় ‘বংপেন’ তন্ময় মুখোপাধ্যায়ের কলমের ক্ষুরধার আঘাতে ১০৮ মিনিটে একবারও মনে হয় নি, ‘যাঃ এটা বাড়াবাড়ি হয়ে গেল’। তাকাতে হয়নি ঘড়ির দিকেও। ওঁদের সংগত দিয়েছেন দেবজ্যোতি মিশ্র। অতিরঞ্জিত সংগীতের প্রলোভন সংবরণ করে যথোপযুক্ত মনোগ্ৰাহী আবহ তৈরী করেছেন তিনি।

এত ভাল কথা লিখলাম বলে কি ছন্দপতন একদমই হয় নি? হয়েছে তো বটেই। দিল্লিবাবুর ভূমিকায় প্রসেনজিৎ একদমই মানানসই নন। ওনার হিন্দি কথায় একটা বাঙালি টান আছে, যা খুব কানে লাগে। মহানায়কের সাথে এক দুর্গাপুজো উদ্যোক্তার চায়ের দৃশ্যটাও অকারণে দীর্ঘায়িত করা হয়েছে। বরং রবীন্দ্রনাথের শেষযাত্রার সিনটা আরও কিছুক্ষণ দেখলে জমত ভাল; ঘোর কাটতে চাইছিল না। ভাস্বর চ্যাটার্জির চরিত্রটিও ঠিকমত ফোটানো যেত বলে মনে হয় আমার। আর বীরেন বাবুর স্ত্রীর ভূমিকায় সুদিপা বসুকে শুধু বাজার ঘরে তোলা আর বিছানা ঠিক করার জন্য নেওয়া কি ঠিক হল?

এই ক’টি সাধারণ ‘ত্রুটি’ উপেক্ষা করলে, ‘মহালয়া’ বাংলা সিনেমার ইতিহাসে অবশ্যই স্থায়ী সিংহাসনের দাবিদার। বাঙালির ইতিহাসে বীরেন্দ্রকৃষ্ণের মত কত যে মনীষী অলক্ষ্যে রয়ে গেলেন, তাদের প্রতি সুবিচার কি করা যায় না?

পুনশ্চঃ এন্ড ক্রেডিট যখন রোল করবে, তখন সিট্ ছেড়ে উঠলে মা দুর্গা পাপ দেবেন।

 

DISCLAIMER: All Images Used In This Post Have Their Respective Copyrights

About Agnivo Niyogi

Typical Aantel, reader, blogger, news addict, opinionated. Digital media enthusiast. Didi fanboi. Joy Bangla!

Posted on March 3, 2019, in film and tagged , , , , , , , , , , , . Bookmark the permalink. Leave a comment.

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: