Blog Archives

বই আলোচনা – সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘আমি কি বাঙালি’

আমি কি বাঙালিবাংলা – অনেক সংগ্রামের সাক্ষী এই ভাষা। ইতিহাস গড়তে ও ভাঙতে দেখেছে বাংলা। স্রোতস্বিনী সময়ের মোড় ঘুরিয়ে রচনা করেছে অনেক নতুন অধ্যায়ের। সেই বাংলা ভাষার ভবিষ্যৎই আজ বিপন্ন। বাংলাভাষী মানুষ আজ কোণঠাসা। হিন্দী বলয়ের আগ্রাসনে নিজের পরিচয় সম্বন্ধে সন্দিহান বাঙালি। এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে যখন নিজের অস্তিত্ব প্রমাণের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে সমগ্র জাতি, তখন স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে বাঙালি কারে কয়?

এই প্রশ্নটি আমারও মনে এসেছিলো বহু বছর আগে। লিখেওছিলাম একটি ব্লগ। তা নিয়ে তর্কালোচনাও হয়েছিল বিস্তর। প্রায় এক দশক পর আবার সেই প্রশ্নের সম্মুখীন হলাম সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের বই ‘আমি কি বাঙালি’ পড়ে। যে দুঃসময়ে আমরা বাস করছি, সেই সময়ে দাঁড়িয়ে এই বইটি যে কতটা সময়োপযোগী তা সহজেই অনুমেয়।

বইটির শুরুতেই লেখক একটি চমৎকার উদ্ধৃতি দিয়ে শুরু করেছেন। নোবেলজয়ী ইসাক বোশেভিস সিঙ্গারের নোবেল বক্তৃতা থেকে তিনি উদ্ধৃত করেন:

“People ask me often, ‘Why do you write in a dying language?’ And I want to explain it in a few words.

Firstly, I like to write ghost stories and nothing fits a ghost better than a dying language. The deader the language the more alive is the ghost. Ghosts love Yiddish and as far as I know, they all speak it.

Secondly, not only do I believe in ghosts, but also in resurrection. I am sure that millions of Yiddish speaking corpses will rise from their graves one day and their first question will be: “Is there any new Yiddish book to read?” For them Yiddish will not be dead.

Thirdly, for 2000 years Hebrew was considered a dead language. Suddenly it became strangely alive. What happened to Hebrew may also happen to Yiddish one day, (although I haven’t the slightest idea how this miracle can take place.)

There is still a fourth minor reason for not forsaking Yiddish and this is: Yiddish may be a dying language but it is the only language I know well. Yiddish is my mother language and a mother is never really dead.”

মাতৃভাষা ও সংস্কৃতিপ্রেমের যে ভাবনা সুনীলবাবু পাঠকের কাছে উত্থাপন করতে চেয়েছেন তার বইয়ের মাধ্যমে, এই উদ্ধৃতিটুকু সেই কাজটাই করে দেয় অনায়াসে। শুধু ইসাক বোশেভিস সিঙ্গারই নন, সুনীলের বইতে উঠে এসেছে জীবনানন্দ দাসের কথাও। এসেছে দেশভাগের প্রসঙ্গ এবং ধর্মের সাথে জাতির দ্বন্দ্বের কথা। এক জায়গায় তিনি বলছেন, ওই লোকটি বাঙালি না মুসলমান এই নির্বোধ প্রশ্ন প্রায় সব শ্রেণীর হিন্দুদের মুখে শোনা যেত।

তিনি আবার লেখেন, ‘অনেক মুসলমানও আগে নিজেদের বাঙালি বলত না, ধর্মীয় পরিচয়টাই ছিল একমাত্র। কিন্তু এই সময় তাদেরও জাতীয় চেতনা জাগে। হিন্দু সদস্যরা সাহেবি পোশাক পরে এসে বক্তৃতায় ইংরেজির ফুলঝুরি ছোটাতেন, লুঙ্গির ওপর পাঞ্জাবি পরা গ্রামের মুসলমানরা এখন বক্তৃতা শুরু করেন বাংলায়।’

তিনি লেখেন, ‘মুসলমান না বাঙালি, অনেকটা এই প্রশ্নেই বাংলা ভাগ হলো। তারপর কিছু বছর পর ওই দিকের স্বাধীন রাষ্ট্রটি, আমাদের মতামত না নিয়েই নাম গ্রহণ করল বাংলাদেশ। এখন পৃথিবীর অনেক দেশেই ধারনা হতে শুরু করেছে বাংলাদেশেই শুধু বাঙালিদের বাস এবং অদূর ভবিষ্যতে কেউ হয়তো জিজ্ঞেস করতে পারে, ভারত নামে দেশটাতেও বাঙালি থাকে নাকি? কিংবা হিন্দুরাও বাঙালি হয়?’

এক জায়গায় সুনীল লিখেছেন যে রামমোহন বঙ্কিমের আমল থেকেই জাতীয় চেতনার উদ্ভব। কিন্তু এই নবজাগরণে থেকে গেছিল একটি বোরো ফাঁক, কারণ তা সীমাবদ্ধ ছিল শুধুই উচ্চ শ্রেণীর হিন্দুদের মধ্যে। মুসলমানরা ব্রাত্যই থেকে গেছিল এই মহাসমারোহে। দেশভাগের পর মাতৃভাষার স্বীকৃতির দাবিতে কিন্তু প্রাণ দিয়েছিলেন মুসলমানরাই। রাজাকরদের চোখ রাঙানিকে তোয়াক্কা না করে স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্নটাও পূর্ববঙ্গের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান বাঙালিদেরই দেখা।

তাই সুনীল লেখেন, “চারজন তরুণ ঢাকার রাজপথে রক্ত দিয়েছিল। তাদের এই আত্মদানে অনুপ্রাণিত হয়ে সমস্ত দেশ প্রতিবাদে উত্তাল হয়ে উঠেছিল। তারপর পাকিস্তানি আমলেই বাংলা ভাষা পেয়েছিল রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি।” এর ফলে কি দুই বাংলা কাছে আসতে পেরেছে? উত্তরটা দুঃখের। সুনীলের কথায়, “পাকিস্তানের একটা অংশ বিচ্ছিন্ন হয়ে বাংলাদেশ হয়েছে। তবু বাঙালি জাতির মিলনের কোনো চিহ্ন নেই এবং দূরত্ব আরও বাড়ছে। বাংলার মিলনের সম্ভাবনা অদূর ভবিষ্যতে আছে বলেও মনে হয় না। কেউ সে কথা উচ্চারণ করে না। তবে বাংলাদেশে যখন আমাকে বিদেশি অতিথি বলে পরিচয় দেওয়া হয়, তখন কেমন যেন লাগে।”

বাঙালির জাতি সংকট কতটা প্রকট তা এই বর্ণিত হয়েছে জীবনানন্দের কথায়। তিনি লিখেছেন, “বাংলা একদিন কোটি কোটি লোকের ভাষা ছিল, বাংলার বাইরে নানা দিকে তার পরিব্যাপ্তি ছিল, মর্যাদা ছিল, কয়েক বছর আগেও দেশের পরিধি প্রায় তিন গুণ বড় ছিল। মননের ও কাজের নানা দিকে বাঙালির ভারতীয় খ্যাতি ছিল। সব কিছুই এত বেশি সঙ্কুচিত হয়ে গেছে, বিপর্যয় এত বেশি, টাকাকড়ির কুশৃঙ্খলা এত কঠিন যে, ভাষা ও সাহিত্য নিয়ে চিন্তা করার সময় খুব সম্ভব দেশের নেই আজকাল।

বাংলার লোকদের অনেকেই আজ উৎখাত এবং প্রায় সব বাঙালিই আজ টাকা ও অন্নের সমস্যায় কাষ্ট পাচ্ছে। বেকার, আধ বেকার, আধপেটা খাওয়া লোক প্রায় ঘরে ঘরে আজ। চাকরি নেই, ঘর নেই, ভাত নেই এ রকম দুঃখ-কষ্ট বাঙালি শিগগির বোধ করেনি। এই সমস্যাই আজ সবচেয়ে বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলার লোকের হাড়, মাংস, চিত্ত থেকে মুখের ভাষা উপভাষার নতুন নতুন বিকাশের পথ আজ আশা করা কঠিন। যে বাংলা একদিন ভাত, কাপড়ে ঘরে তৃপ্তি পেয়ে গল্প রূপকথা বচন ছড়া ইত্যাদি তৈরি করেছিল বাংলার সেই হৃদয় নেই এখন, সেসব লোক নেই, সে প্রবাদ ছড়া লেখা-লেখন নতুন যুগে কোনো যুক্তিঘন ক্রমবিকাশ লাভ করল না, মরেই গেল মানুষই মরে যাচ্ছে বলে।”

তার অমোঘ বাণী যে বহু দশক পরেও প্রাসঙ্গিক থাকবে, তা কি জীবনানন্দ জানতেন? বৈচিত্রময় এই ভারতবর্ষে যেভাবে একটি ভাষা চাপিয়ে দেওয়ার ষড়যন্ত্র চলছে, তার প্রতিকার করতে দরকার এক চেতনার। পশ্চিমবঙ্গীয় বাঙালি কি পারে না ওপার থেকে প্রেরণা নিতে?

বাংলাদেশে মমতা

Bhasha Shahid Minar

Image Source: Wikipedia

আবেগ আর উষ্ণতার যে সম্পর্ক বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গকে একসূত্রে বেঁধে রেখেছে, তাই ঝালাই করতে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়  তিন দিনের সফরে আজ  ঢাকা সফরে গেছেন। বাংলাদেশ সফরের সময় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন। ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় শহীদ মিনারে যাবেন। তিনি বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘরও পরিদর্শন করবেন।

মুখ্যমন্ত্রী এমন এক সময় ঢাকা গেছেন যা বাঙালির মননে এক অতি সংবেদনশীল এক সময়। ২১শে ফেব্রুয়ারী ১৯৫২ তে যে নির্মম হত্যালীলা চালায় পাকিস্তান সরকার তার ক্ষত আজও হয়তো পূর্ণ হয়নি। তাই তো আজও ফেব্রুয়ারী মাসের এই সময়টা মন শুধু বলে ওঠে, আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারী, আমি কি ভুলতে পারি?

দুদেশের সংস্কৃতিক বন্ধন আরও দৃঢ় করতে বদ্ধপরিকর পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী। দুই বাংলার জন্যই এ এক ঐতিহাসিক দিন। দুই বাংলার মধ্যে দিয়ে চলে গেছে এক কাঁটা তারের বেড়া। কিন্তু দুই বাংলার মানুষ আজও একে অপরের সাথী, মননে, শিল্পে, কৃষ্টিতে। দুই বাংলার ভালবাসার বন্ধন, মৈত্রীর বন্ধন, ভাতৃত্বের বন্ধন আরও দৃঢ় হোক, সাধারণ মানুষ তাই চায়।

আমাদের সকলের দিদি মৈত্রীর বার্তা নিয়ে ঢাকায় পৌঁছে গেছেন, আর সকাল থেকেই একটা গান মাথায় গুনগুন করছে:

আজি বাংলাদেশের হৃদয় হতে কখন আপনি তুমি এই অপরূপ রূপে বাহির হলে জননী!
ওগো মা, তোমায় দেখে দেখে আঁখি না ফিরে!

রওনা হওয়ার ঠিক আগে দিদি নিজেই ট্যুইট করেছেন:

বিশ্বকবির সোনার বাংলা, নজরুলের বাংলাদেশ,
জীবনানন্দের রূপসী বাংলা, রূপের যে তার নাইকো শেষ

শত্তুরের মুখে ছাই দিয়ে দুই বাংলার নাড়ির টান ও ভালবাসার আদানপ্রদান যেন ক্রমবর্ধমান হয়, সর্বশক্তিমানের কাছে এই প্রার্থনা।

DISCLAIMER: All Images Used In This Post Have Their Respective Copyrights

%d bloggers like this: