Blog Archives

পাঠ প্রতিক্রিয়া: নেতাজী এক নিষিদ্ধ সত্য (সায়ক সেন)

নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু। একটা নাম যা উদ্বুদ্ধ করে গোটা দেশকে। স্বাধীনতার সংগ্রামে যার অনমনীয় লড়াই বাধ্য করেছিল ইংরেজদের দেশ ছাড়তে। দেশনায়ক সুভাষ – যার ডাকে সাড়া দিয়ে দেশের মুক্তির লক্ষ্যে রক্ত দিতে প্রস্তুত হয়েছিল অসংখ্য নওজোয়ান। সুভাষ – ইংরেজদের চাকরি ছেড়ে দেশের কাজে নিজের জীবন উৎসর্গিত করা এক প্রত্যয়ের নাম। কিন্তু দেশের জন্য সবটুকু দিলেন যিনি, প্রতিদানে কী পেলেন? শুধুই বঞ্চনা।

১৯৪৫ সালে তথাকথিত বিমান দুর্ঘটনার পর নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু মারা গেছিলেন কিনা, বেঁচে থাকলে তাঁর সাথে কী হয়েছিল, সুভাষ ঘরে ফিরেছিল কিনা – এরকম একরাশ প্রশ্নের উত্তর আজও জানে না দেশবাসী। স্বাধীনতার পর দুটো কমিটি/কমিশনের নামে যা প্রহসন হয়েছে তা লজ্জিত করবে যে কোনও নাগরিককে। দেশনায়কের স্মৃতির উদ্দেশ্যে এইটুকু কি করতে পারি না আমরা? সুভাষচন্দ্র বসুর শেষ কটা দিন কেটেছিল কিভাবে তা জানার অধিকার আছে ভারতবাসীর।

সুভাষ অন্তর্ধান রহস্য উন্মোচনে গত দেড়-দুই দশক ধরে লড়াই করে চলেছে অনেক সংগঠন। তাদের মধ্যে অন্যতম ‘মিশন নেতাজী’ – এই সংগঠনের অনুজ ধর ও চন্দ্রচূড় ঘোষের নাম আজ লোকমুখে ফেরে (সৌজন্যে সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের ছবি গুমনামী)। তাদেরই এক সহযোদ্ধা সায়ক সেন নেতাজী অন্তর্ধান রহস্যে আলোকপাত করার উদ্দেশ্যে লিপিবদ্ধ করেছেন এই বই ‘নেতাজী – এক নিষিদ্ধ সত্য’।

আজ থেকে প্রায় পঁচাত্তর বছর আগে নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর তথাকথিত মৃত‍্যু নিয়ে যে রহস‍্য ঘনীভূত হয়েছিল, আজ ২০২১-এ দাঁড়িয়ে তা এক জটিল মায়াজালের সৃষ্টি করেছে। দীর্ঘ সময় ধরে চলে আসা নানা গোপনীয় কার্যকলাপ এবং তার ভিতরে লুকিয়ে থাকা প্রকৃত সত্যকে উদঘাটন করার এক প্রয়াস এই বই। তাইহোকু বিমান দুর্ঘটনায় যে নেতাজীর মৃত্যু হয়নি, তা অকাট্য প্রমাণ দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছেন লেখক। তুলে ধরেছেন শাহনাওয়াজ কমিটি ও খোসলা কমিশনের নামে হওয়া প্রহসনের চেপে দেওয়া আসল সত্য। কেন ধামাচাপা দেওয়া হল মুখার্জি কমিশনের রিপোর্ট? তোলা হয়েছে সেই প্রসঙ্গও।

তবে কি, নেতাজীর অন্তর্ধানের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে স্বাধীনতা-উত্তর ভারতের সমসাময়িক ইতিহাস? নেতাজীর প্রত্যাবর্তনের খবর চাউর হলে সবচেয়ে ক্ষতি হত কাদের? কেনই বা দেশে ফিরেও কলকাতায় ফিরলেন না সুভাষ? উত্তর প্রদেশের অখ্যাত এক সন্ন্যাসীর সাথে দেশনায়কের কী যোগ? আর প্রভূত প্রতিশ্রুতি দিয়েও নেতাজীর স্মৃতিরক্ষায় কেন ব্যর্থ হল বিজেপি সরকার? সব প্রশ্নের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ আছে এই বইতে। স্বচ্ছল ভাষা, প্রাঞ্জল লেখনী এবং ‘ফ্রি ফ্লোয়িং কনভার্সেশনের’ ছন্দে লেখা এই বই, যার জন্য সাধুবাদ প্রাপ্য লেখকের।

অনুজ ধর ও চন্দ্রচূড় ঘোষের ”India’s Biggest Cover Up’ ও ‘Conundrum’ যারা পড়েছেন তাদের হয়তো মনে হতেই পারে নতুন সেরকম তথ্য তো পেলাম না। কিন্তু যে কারণে আমার এই বইটি ভালো লেগেছে তা হল, খুব সহজে গূঢ় একটি বিষয়ের প্রতিস্থাপন করেছেন সায়ক সেন। এবং অনেক জায়গাতেই অনুজ ধর ও চন্দ্রচূড় ঘোষের ঋণ স্বীকার করেছেন তিনি।
তাই, প্রকৃত নেতাজী প্রেমিকদের অবশ্য পাঠ্য হওয়া উচিত এই বইটি। ভারতের ইতিহাসের এক নিষিদ্ধ সত্য উন্মোচনের সময় অতিক্রান্ত। প্রাপ্য সম্মানটুকু দেওয়া হোক দেশনায়ককে।

পাঠ প্রতিক্রিয়া – মগ্নপাষাণ (সূর্যনাথ ভট্টাচার্য)

ভারতের ইতিহাসে সম্রাট অশোকের নাম চিরকালীন। মৌর্য বংশের কুলপ্রদীপ এই মগধনরেশের বীরগাঁথা আজও জনমানসে যথেষ্ট কৌতূহল উদ্রেক করে। কলিঙ্গ যুদ্ধ এবং চণ্ডাশোকের ধর্মাশোকে উত্তরণের কাহিনী সকলেরই জানা। বৌদ্ধ ধর্মের প্রচারক হিসেবেও অশোকের সুনাম দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে আছে। তাঁর শাসনকালে তৈরি স্তুপগুলি তো জনপ্রিয় পর্যটন স্থল। আর অশোক চক্র দেশের জাতীয় পতাকায় সমুজ্জ্বল।

কিন্তু এই অশোকের জীবনে রয়েছে এক অজানা অধ্যায়। সম্রাট বিন্দুসারের প্রয়াণের পর নিজের সহোদরদের হত্যা করে কীভাবে সিংহাসন লাভ করেছিলেন তিনি, তা নিয়ে ধোয়াঁশা আজও। সম্রাট পদে আসীন হওয়ার আগে তাঁর জীবনের বেশ কিছু বছরের হিসেব নেই ইতিহাসের পাতায়। লেখক সূর্যনাথ ভট্টাচার্যের এই আখ্যানে উঠে এসেছে সেই গল্পই।

সম্রাট বিন্দুসারের এক নিচ কুলের রানীর সন্তান ‘প্রিয়দর্শন’। রাজমহলে তাচ্ছিল্যের পাত্র সে। অগ্রমহিষীর সন্তান সুসীমের সাথে তাঁর দ্বন্দ্ব। তাঁর বন্য স্বভাবের জন্য প্রজারা ভয় পেতেন তাঁকে। সম্রাটের মৃত্যুর পর এক ভয়াল রাজনৈতিক পরিস্থিতির সম্মুখীন হয় পাটালিপুত্র। মগধের পরবর্তী নরেশ কে হবেন তা নিয়ে শুরু হল দুই ভাইয়ে ভয়ঙ্কর লড়াই, যা চলল দীর্ঘ চার বছর। এই দ্বন্দে নানা সময় নানা পাত্রের আগমন। জড়িয়ে গেল তিন্দারী গ্রামের হতভাগ্য, নিষ্পাপ নিবাসীদের ভবিষ্যৎও।

সূর্যনাথ ভট্টাচার্যের অসামান্য লেখনীর মাধ্যমে অশোকের জীবনকাহিনী এক অন্য মাত্রা পায়। তাঁর ভাষার দক্ষতা, লেখায় অপ্রচলিত শব্দকোষের মন্ত্রমুগ্ধকর ব্যবহার বাংলা ভাষাপ্রেমী হিসেবে সমৃদ্ধ করে পাঠককে। গল্পের ঠাসবুনোট ও নাটকীয়তার সংমিশ্রণ বিবশ করে একনাগাড়ে বইটি পড়ে যেতে। আর শেষ পাতার পর রবীন্দ্রনাথের অমোঘ সেই লাইনের কথা মনে পড়ে, ‘শেষ হইয়াও হইল না শেষ’ – ইচ্ছে হয় যেন শীঘ্রই এই আখ্যানের সিক্যুয়াল প্রকাশ হয়।

ইতিহাসধর্মী লেখা আজকাল প্রকাশিত হচ্ছে প্রচুর। কিন্তু অধিকাংশ কাজই পাতে দেওয়ার মত নয়। মধ্যমতার এই ভিড়ে ‘মগ্নপাষাণ’ অবশ্যই তফাতে উজ্জ্বল হয়ে থাকবে।

%d bloggers like this: