Blog Archives

পাঠ প্রতিক্রিয়া – মিহির সেনগুপ্তর সিদ্ধিগঞ্জের মোকাম

মিহির সেনগুপ্ত বাংলার অন্যতম অসাধারণ এক লেখক। তাঁর রচনায় উঠে আসে বাংলা ভাগের যন্ত্রণা, ছিন্নমূল মানুষের কাতর কাহিনী। এপার, ওপার বাংলার সীমানা ছাড়িয়ে তাই ওনার লেখা কালজয়ী হয়ে ওঠে। আত্মজীবনীমূলক রচনা হলেও, তাঁর মনের কথা যেন বাঙালি জাতির দুঃখের বহমান স্মৃতিকথা।

সব মানুষেরই থাকে এক সিদ্ধিগঞ্জের মোকাম। সে মোকামের ঠিকানা একেকজনের একেক রকম। কেউ বা প্রযত্নে থাকে মঠ-মন্দির-মসজিদ-গির্জার, কেউ বা আবার গগনচুম্বি অট্টালিকার, সাতমহলা বাড়ির, ধন-ঐশ্বর্যের চোখধাধানো সমারোহের। লেখকের সিদ্ধিগঞ্জের মোকামখানা রয়েছে হৃদয়েশ্বরী জলেশ্বরীর কোলের মধ্যে।

দেশভাগের তিরিশ-চল্লিশ বছর পরে, ১৯৮৬ থেকে ১৯৯২ সাল, এই ছ’বছর পূজার সময় মিহিরবাবু নিজের গ্রাম এবং কীর্তিপাশায় ছুটি কাটান। সেই অভিজ্ঞতারই ছবি সিদ্ধিগঞ্জের মোকাম। সিদ্ধিগঞ্জের মোকাম ফকিরের বাসস্থান। পীর-ফকিরের দরগায় মানুষ যায় গুরুর সন্ধানে, আত্মার শান্তির আশায়। পরগণা সেলিমাবাদের অখ্যাত গ্রামকটির জীবনে সেই মোকামের সন্ধান পেয়েছেন মিহিরবাবু।

দেশভাগের আগে পূর্ববঙ্গের গ্রামাঞ্চলে হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে যে সদ্ভাব ছিল, তাই বর্ণিত হয়েছে এই গল্পে। মালাউন নিবারণ আর শ্যাখের ব্যাডা মুইনুদ্দিনের সম্পর্ক কিংবা গ্রামাঞ্চলের দুর্গাপুজোয় তামাসা দেখতে আসা মুসলমানদের কথা মন ভরিয়ে দেয়। দুর্গাপুজোই হোক বা ঈদ সব উৎসবেই একসাথে মেতে ওঠেন গ্রামবাসীরা। ধর্মের ভেদাভেদের ঊর্ধ্বে সকলেই বাঙালি হয়ে ওঠে।

আরেকটি কথা না বললেই না। তা হল বইয়ের ভাষা। আমরা যারা শহুরে কলকাতা-কেন্দ্রিক বাংলা পড়তে অভ্যস্ত, তাদের কাছে এই গল্পের ভাষা কঠিন, আবার দুর্বোধ্যও মনে হতে পারে। কিন্তু লেখক তাঁর অঞ্চল (বরিশাল) এর উপভাষা অতি সূক্ষ্ণতার সাথে ফুটিয়ে তুলেছেন। ওঁর লেখনীর মাধ্যমে নতুন করে পরিচয় হল বাংলা ভাষার সঙ্গে।

দেশভাগ উত্তর পর্বে, বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ওপার বাংলার জনজীবন সম্পর্কিত অন্যতম শ্রেষ্ঠ বই এই ‘সিদ্ধিগঞ্জের মোকাম’। হিন্দু-মুসলমান সম্প্রদায়ের পারস্পরিক সম্পর্কের এক সুন্দর আখ্যান এই বই। ফেলে আসা সময়ের হাতছানি এই বই জুড়ে। পূর্ববঙ্গে শিকড় যে সব বাঙালির, তাদের অন্তরে প্রভাব ফেলবেই মিহিরবাবুর লেখা বই।

বই – সিদ্ধিগঞ্জের মোকাম
লেখক – মিহির সেনগুপ্ত
প্রকাশক – সুপ্রকাশ
মূল্য – ৩৫০ টাকা

%d bloggers like this: