Blog Archives

পাঠ প্রতিক্রিয়া – অপারেশন ব্ল্যাক অ্যারো (সুদীপ চট্টোপাধ্যায়)

“ওরে হাল্লা রাজার সেনা, তোরা যুদ্ধ করে করবি কী তা বল”

যুদ্ধ – বিশ্বজুড়ে যদি কোনও একটা organised industry থাকে সেটা হল যুদ্ধ শিল্প। কখনও মুক্তির সংগ্রাম, কোথাও গণতন্ত্রর লড়াই, ধর্মীয় সংগ্রাম কিংবা স্রেফ সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন – নানা সময়ে, নানা দেশে যুদ্ধ হয়েছে, হচ্ছে। আর এই যুদ্ধ শিল্পের সাথে সুনিপুণ ভাবে জড়িয়ে আছে বেআইনি অস্ত্র কারবার, মানি লন্ডারিং এবং এস্পিওনাজ। সাধারণ লোকচক্ষুর আড়ালে চলছে ভয়াবহ এক খেলা।

সুদীপ চট্টোপাধ্যায়ের এই বইটি বাংলা ভাষায় একপ্রকার অনবদ্য। আমি অন্তত এস্পিওনাজ নিয়ে এর আগে বাংলায় সেরকম কোনও বই পড়িনি (আর আমি থ্রিলার পড়তে খুব ভালোবাসি)। মধ্য প্রাচ্যে একদিকে মাথা গজিয়েছে আইসিস, অন্যদিকে ইজরায়েলে চলছে প্যালেস্টাইনের লড়াই। এর সাথে জুড়ে গেছে মেক্সিকোর ড্রাগ কার্টেল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এক বরখাস্ত ডিইএ এজেন্ট এই চক্রের পর্দাফাঁস করার জন্য কখনও ভারত আবার কখনও ইজরায়েল পারি দিচ্ছেন। কিন্তু কেন? মোসাদের সাথেই বা তার কী যোগ?

অপারেশন ব্ল্যাক অ্যারো বইটি পড়তে পড়তে বদলে যাওয়া যুদ্ধের সংজ্ঞার সাথে পরিচিতি হয়। বিশ্বযুদ্ধ, ঠান্ডা যুদ্ধের যুগ পেরিয়ে এখন সাইবার ক্রাইমের রমরমা। কম্পিউটারের এক ক্লিকে বিশ্বের যে কোনও প্রান্তে ঘটে যাচ্ছে নাশকতার ছক। কম্পিউটার স্ক্রিনের আড়ালে চলছে ব্যাপক সন্ত্রাস। ২০২১ এ দাঁড়িয়ে যথেষ্ট যুগোপযোগী একটি স্পাই থ্রিলার এই বইটি।

প্রথম প্রথম মনে হবে ‘হোমল্যান্ড’ এর বাংলা সংস্করণ পড়ছি। মাঝে মাঝে তথ্যের আতিশয্যে ধৈর্যচ্যুতিও ঘটবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ম য়দানে টিকে থাকলে পয়সা যে উসুল হবে, তা নিশ্চিত। সুদীপ চট্টোপাধ্যায়ের চিত্তাকর্ষক রিসার্চ মন কাড়বে। আর যে কোনও থ্রিলারের মতই যথেষ্ট fast-paced ঘটনাবহুল page-turner বইটি। হাতে সময় থাকলে one-sitting এই অনায়াসে পড়ে ফেলা যায়।

যাদের গুপ্তচরবৃত্তি এবং রোমহর্ষক থ্রিলার পড়তে ভালো লাগে, অবশ্যই পড়ুন বইটি। বস্তাপচা ঐতিহাসিক, আধিভৌতিক ফিকশনের তুলনায় তো ভালোই।

পাঠ প্রতিক্রিয়া: নেতাজী এক নিষিদ্ধ সত্য (সায়ক সেন)

নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু। একটা নাম যা উদ্বুদ্ধ করে গোটা দেশকে। স্বাধীনতার সংগ্রামে যার অনমনীয় লড়াই বাধ্য করেছিল ইংরেজদের দেশ ছাড়তে। দেশনায়ক সুভাষ – যার ডাকে সাড়া দিয়ে দেশের মুক্তির লক্ষ্যে রক্ত দিতে প্রস্তুত হয়েছিল অসংখ্য নওজোয়ান। সুভাষ – ইংরেজদের চাকরি ছেড়ে দেশের কাজে নিজের জীবন উৎসর্গিত করা এক প্রত্যয়ের নাম। কিন্তু দেশের জন্য সবটুকু দিলেন যিনি, প্রতিদানে কী পেলেন? শুধুই বঞ্চনা।

১৯৪৫ সালে তথাকথিত বিমান দুর্ঘটনার পর নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু মারা গেছিলেন কিনা, বেঁচে থাকলে তাঁর সাথে কী হয়েছিল, সুভাষ ঘরে ফিরেছিল কিনা – এরকম একরাশ প্রশ্নের উত্তর আজও জানে না দেশবাসী। স্বাধীনতার পর দুটো কমিটি/কমিশনের নামে যা প্রহসন হয়েছে তা লজ্জিত করবে যে কোনও নাগরিককে। দেশনায়কের স্মৃতির উদ্দেশ্যে এইটুকু কি করতে পারি না আমরা? সুভাষচন্দ্র বসুর শেষ কটা দিন কেটেছিল কিভাবে তা জানার অধিকার আছে ভারতবাসীর।

সুভাষ অন্তর্ধান রহস্য উন্মোচনে গত দেড়-দুই দশক ধরে লড়াই করে চলেছে অনেক সংগঠন। তাদের মধ্যে অন্যতম ‘মিশন নেতাজী’ – এই সংগঠনের অনুজ ধর ও চন্দ্রচূড় ঘোষের নাম আজ লোকমুখে ফেরে (সৌজন্যে সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের ছবি গুমনামী)। তাদেরই এক সহযোদ্ধা সায়ক সেন নেতাজী অন্তর্ধান রহস্যে আলোকপাত করার উদ্দেশ্যে লিপিবদ্ধ করেছেন এই বই ‘নেতাজী – এক নিষিদ্ধ সত্য’।

আজ থেকে প্রায় পঁচাত্তর বছর আগে নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর তথাকথিত মৃত‍্যু নিয়ে যে রহস‍্য ঘনীভূত হয়েছিল, আজ ২০২১-এ দাঁড়িয়ে তা এক জটিল মায়াজালের সৃষ্টি করেছে। দীর্ঘ সময় ধরে চলে আসা নানা গোপনীয় কার্যকলাপ এবং তার ভিতরে লুকিয়ে থাকা প্রকৃত সত্যকে উদঘাটন করার এক প্রয়াস এই বই। তাইহোকু বিমান দুর্ঘটনায় যে নেতাজীর মৃত্যু হয়নি, তা অকাট্য প্রমাণ দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছেন লেখক। তুলে ধরেছেন শাহনাওয়াজ কমিটি ও খোসলা কমিশনের নামে হওয়া প্রহসনের চেপে দেওয়া আসল সত্য। কেন ধামাচাপা দেওয়া হল মুখার্জি কমিশনের রিপোর্ট? তোলা হয়েছে সেই প্রসঙ্গও।

তবে কি, নেতাজীর অন্তর্ধানের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে স্বাধীনতা-উত্তর ভারতের সমসাময়িক ইতিহাস? নেতাজীর প্রত্যাবর্তনের খবর চাউর হলে সবচেয়ে ক্ষতি হত কাদের? কেনই বা দেশে ফিরেও কলকাতায় ফিরলেন না সুভাষ? উত্তর প্রদেশের অখ্যাত এক সন্ন্যাসীর সাথে দেশনায়কের কী যোগ? আর প্রভূত প্রতিশ্রুতি দিয়েও নেতাজীর স্মৃতিরক্ষায় কেন ব্যর্থ হল বিজেপি সরকার? সব প্রশ্নের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ আছে এই বইতে। স্বচ্ছল ভাষা, প্রাঞ্জল লেখনী এবং ‘ফ্রি ফ্লোয়িং কনভার্সেশনের’ ছন্দে লেখা এই বই, যার জন্য সাধুবাদ প্রাপ্য লেখকের।

অনুজ ধর ও চন্দ্রচূড় ঘোষের ”India’s Biggest Cover Up’ ও ‘Conundrum’ যারা পড়েছেন তাদের হয়তো মনে হতেই পারে নতুন সেরকম তথ্য তো পেলাম না। কিন্তু যে কারণে আমার এই বইটি ভালো লেগেছে তা হল, খুব সহজে গূঢ় একটি বিষয়ের প্রতিস্থাপন করেছেন সায়ক সেন। এবং অনেক জায়গাতেই অনুজ ধর ও চন্দ্রচূড় ঘোষের ঋণ স্বীকার করেছেন তিনি।
তাই, প্রকৃত নেতাজী প্রেমিকদের অবশ্য পাঠ্য হওয়া উচিত এই বইটি। ভারতের ইতিহাসের এক নিষিদ্ধ সত্য উন্মোচনের সময় অতিক্রান্ত। প্রাপ্য সম্মানটুকু দেওয়া হোক দেশনায়ককে।

%d bloggers like this: